বিচ্ছিন্নতা ও একাকিত্বে মিল আছে, কিন্তু তারা এক বস্তু নয়। একাকিত্ব কখনো কখনো প্রয়োজনীয়, অনেক সময় সৃষ্টিশীল, এমনকি স্বাস্থ্যপ্রদও। কিন্তু বিচ্ছিন্নতা সর্বদাই অসুস্থতার লক্ষণ। বলা যায় যে, সে নিজেই একটা অসুখ। এই বিচ্ছিন্নতা মানুষের জীবনে খুবই সত্য।
নানা কারণে তা ঘটে। শোক, দুঃখ, দুর্যোগ মানুষকে আলাদা করে দেয়। সে-ধরনের বিচ্ছিন্নতার কথা এ বইতে আছে। কিন্তু মূল বিবেচনাটা হচ্ছে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা। মানুষ একই সঙ্গে বুদ্ধিমান ও সামাজিক প্রাণী; কিন্তু তার স্বাধীনতা, বুদ্ধিমত্তা, সৃষ্টিশীলতা, ন্যায়-অন্যায় বোধ কোনোকিছুই বিকশিত হয় না যদি সে সামাজিক সমর্থন না পায়। এই সমর্থন তথাকথিত আইনের শাসনের তুলনাতেও অনেক বেশি জরুরি ও কার্যকর। এটি না-থাকলে ব্যক্তি মানুষ খর্ব ও নিরাপত্তাহীনতার ভেতর পড়ে।
বিচ্ছিন্নতা সবকালেই সত্য ছিল; একালে তা বিশেষ একটা রূপ নিয়েছে এবং এক ধরনের প্রবলতা লাভ করেছে। যার কারণ হচ্ছে পুঁজিবাদ। পুঁজিবাদ রাষ্ট্র, সমাজ, সংস্কৃতি পরিবার সবকিছুর ওপরই হাত রেখেছে; এবং নিষ্ঠুর হস্তক্ষেপে মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে সমষ্টিগত জীবন থেকে।
এই বিচ্ছিন্নতাকে মিথ্যা করে দেওয়াটা আবশ্যক। কাজটা কঠিনই নয় শুধু, এর লক্ষ্য অর্জন প্রায় অসম্ভব। কেননা মূল সমস্যাটা বৈষম্যের, সেটা যতদিন থাকবে ততদিন বিচ্ছিন্নতা দূর হবে না। কিন্তু বিচ্ছিন্নতা দূর করার চেষ্টা চলবে। পথটা হচ্ছে আন্দোলনের; আন্দোলন মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে, এবং বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
‘বিচ্ছিন্নতার সত্য-মিথ্যা’ বইয়ের প্রবন্ধগুলোতে বর্তমান সময়ে আমাদের বিচ্ছিন্নতার নানা রূপ এবং তা দূর করার আন্দোলনটা কেমন হওয়া দরকার তা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী (জন্ম. ১৯৩৬) পেশায় সাহিত্যের অধ্যাপক এবং অঙ্গীকারে লেখক। এই দুই সত্তার ভেতর হয়তো একটা দ্বন্দ্বও রয়েছে, তবে সেটা অবৈরী, মোটেই বৈরী স্বভাবের নয়। পেশাগত জীবনে তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক, অবসরগ্রহণের পর ওই বিশ্ববিদ্যালয়েরই প্রফেসর এমেরিটাস হিসাবে মনোনীত হয়েছেন। তিনি শিক্ষা লাভ করেছেন রাজশাহী, কলকাতা, ঢাকা এবং ইংল্যান্ডের লীডস ও লেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে। লেখার কাজের পাশাপাশি তিনি ‘নতুন দিগন্ত’ নামে সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক একটি ত্রৈমাসিক পত্রিকা সম্পাদনা করছেন। তার গ্ৰন্থসংখ্যা আশির কাছাকাছি। তার অকালপ্রয়াত স্ত্রী ড. নাজমা জেসমিন চৌধুরীও লিখতেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন।