দূরবীনের অণুবীক্ষণ: এক প্রযুক্তিবিদের মহাজাগতিক পলায়ন ও আত্ম-আবিষ্কারের গল্প
যান্ত্রিক জীবনের সব জটিল হিসেব-নিকেশ আর ফেসবুকের রাজনৈতিক কোলাহল ফেলে কেন এক সফল প্রযুক্তিবিদ ব্লু-রিজ পাহাড়ের নির্জন কেবিনে আশ্রয় নিলেন? এটি কি স্রেফ পলায়ন, না কি নিজেকে পুনরাবিষ্কারের এক দুর্দান্ত প্রচেষ্টা? মুহাম্মদ শামীমুজ্জামান-এর এই ‘দার্শনিক দিনলিপি’ প্রবাস জীবনের ডায়েরিকে এমন এক পরিসরে নিয়ে আসে, যেখানে যান্ত্রিকতা ও দর্শন মিলে যায় অপূর্ব এক সন্ধিক্ষণে।
বইটির পাতায় পাতায় অণুবীক্ষণ যন্ত্রের তলায় জীবনের ক্ষুদ্র সংঘাতগুলো কুরুক্ষেত্র মনে হলেও দূরবীনের চোখে তা ধরা দেয় মহাজাগতিক সম্প্রীতি হিসেবে। জাপানি ‘কিনৎসুকি’ শিল্প যেমন ভাঙা টুকরোগুলো সোনার আঠায় জুড়ে ক্ষতকে অলঙ্কার বানায়, লেখকের কলমও ব্যর্থতা আর ফাটলের মাঝে সুন্দরের হদিস দেয়। বারান্দার একা চেয়ারটি নিঃসঙ্গতাকে বিসর্জন দিয়ে নিজের আত্মার সাথে কথোপকথনের রাজকীয় বিলাস উপহার দেয় পাঠককে।
পেশাগত জীবনে কোটি টাকার প্রলোভন অগ্রাহ্য করে ব্যবহারকারীদের গোপনীয়তা রক্ষা করার যে সাহস লেখক দেখিয়েছেন, তা বর্তমান যুগে ‘জ্যেষ্ঠাধিকার’ বা আদর্শ রক্ষার এক বিরল ধ্রুপদী উদাহরণ। এখানে আলবার্ট আইনস্টাইনের ‘দৃষ্টিবিভ্রম’ তত্ত্বের সাথে লালন সাঁইয়ের ‘অচিন পাখি’ কিংবা জালালউদ্দিন রুমির মরমী দর্শন একই মোহনায় এসে মিশেছে। ‘বাবার ছায়া’ গাছ আর ‘বাগান বুড়ো’র প্রজ্ঞার মধ্য দিয়ে লেখক প্রমাণ করেছেন যে, প্রকৃত সার্থকতা স্রেফ জয় করাতে সীমাবদ্ধ থাকার পরিবর্তে অন্যকে ছায়া দেওয়ার সামর্থ্যে বেঁচে থাকে।
‘দূরবীনের অণুবীক্ষণ’ আপনাকে শেখাবে কীভাবে জীবনের ‘টাইম প্যারাডক্স’ থেকে মুক্তি পেয়ে বর্তমানে বেঁচে থাকতে হয়। পাহাড়ের এই নির্জন ‘কর্মশালায়’ লেখক শান্তি খুঁজে পাওয়ার পরিবর্তে বরং শান্তি তৈরি করেছেন। যাঁরা জীবনের ইঁদুরদৌড়ে ক্লান্ত হয়ে ধ্রুবতারার সন্ধান করছেন, তাঁদের জন্য এই বইটি হতে পারে এক নির্ভুল ‘মানসিক কম্পাস’। একবার পড়া শুরু করলে এই বই আপনাকে শেষ পাতা পর্যন্ত কিছু ‘পড়তে’ আসার বদলে অনুপ্রাণিত করবে নতুন কিছু ‘হতে’।