মুহূর্তে খবর ছড়িয়ে পড়লো অলোক সোনিয়ার বিয়ে। বিবাহ হবে একমাস পর জৈষ্ঠ্যমাসে উত্তর ভেন্নাবাড়ী গ্রামে।
সোনিয়ার বাবা-মা যথাসময়ে এসে পৌঁছালেন। বাবা জনাব তানভীর হায়দার এ গাঁয়ের সন্তান হলেও গত চল্লিশ বছর হয় তিনি সিঙ্গাপুরে স্থায়ীভাবে বসবাস করে আসছেন। ছাত্র জীবনে অত্যন্ত মেধাবী এই যুবক ভালোবেসে বিবাহ করেন এক ক্রিশ্চিয়ান মেয়েকে। সোনিয়ার দাদাদাদির এ বিবাহে মত ছিল না। একমাত্র সন্তানের এমন সিদ্ধান্তে তারা হতবিহ্বল হয়ে পড়েন। এলাকায় সামাজিক রীতিনীতি, ধর্মীয় শ্রদ্ধাবোধের কথা চিন্তা করে এ বিবাহ তারা মেনে নেননি। শেষমেশ তানভীর হায়দার নববধূর পৈত্রিক নিবাস সিঙ্গাপুরের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান। জনাব হায়দার সাহেবের জন্মস্থান এখন কেবলই স্মৃতি, বহুদিন হয় পিতামাতা গত হয়েছেন। তার সহায় সম্পত্তি ভোগদখল করেন আপন এক চাচাতো ভাই।
গাঁয়ে কোনো কনভেনশন সেন্টার না থাকায় শেখ মুজিব আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বিবাহ অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। ঐতিহ্যবাহী খেয়াঘাট যেখানটায় অলোকের সাথে সোনিয়ার প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল সেই স্মৃতি চিরস্মরণীয় করে রাখার জন্য টোং দোকানগুলো ইতোমধ্যে লাইটিং করা হয়েছে। গাঁয়ের একমাত্র প্রবেশপথ ত্রিমুখী ব্রিজটি বিজলিবাতি দেয়ায় এর সৌন্দর্য বোধকরি ইতিপূর্বে এ গ্রামের কেউ কখনো দেখেনি। ব্রিজ থেকে হলুদ বর্ণাভ আলো মধুমতি খালের ওপর পড়েছে, দূর থেকে কী যে ভালো লাগছে, কেবলই মনে হচ্ছে লেখালেখি বাদ দিয়ে যদি এ গাঁয়ে থেকে যেতে পারতাম।
সন্ধ্যা নামলেই হয়, লোকের ভিড় পড়ে যাচ্ছে এখানটায়। শুধু মানুষ আর মানুষ। আশপাশের গ্রাম ছাড়াও এ প্রবেশপথ দিয়ে জেলা শহর থেকে কর্মব্যস্ত শতশত মানুষ দিনশেষে বাড়ি ফেরার সময় বাজারের কাছে এসেই রিকশা ছেড়ে দিচ্ছে। অলোক সোনিয়ার বিবাহের খবর এখন সবার মুখে মুখে। যদিও বলা চলে অধিকাংশ লোক সোনিয়া এবং তার বাবার পরিচয় জানেন না। এ কারণে কৌতূহলের শেষ নেই। তবে সোনিয়াকে অনেকেই চিনে। গত বছর দাদাবাড়ি বেড়াতে এসে গাঁয়ের এমন কোনো আঙ্গিনা নেই যেখানে তার পা পড়েনি। গাঁয়ের ছেলেমেয়েদের সাথে মেঠোপথ ধরে হৈচৈ আড্ডা, মুজিব বাজারে বসে চা-কফি; মাত্র একটা সপ্তাহে একযুগের স্মৃতি। সোনিয়ার সাথে আবার দেখা হবে, কিংবা এ আজো পাড়া গাঁয়ে কোনো একদিন তার শুভবিবাহ হবে- এটা ছিলো তাদের কাছে কল্পনাতীত। সোনিয়ার ভালোবাসায় মুগ্ধ হয়ে তার এ বিবাহ অনুষ্ঠানে প্রত্যেকেই কাঁধে কাঁধ মিলে কাজে সামিল হয়েছে।
বিবাহে এক ব্যতিক্রমী দাওয়াত পেয়েছে আশপাশের গাঁও-গ্রামের মানুষজন। নবদম্পতিকে আশীর্বাদ করার জন্য মাইকিং করে একযোগে সবাইকে অনুষ্ঠানে আসতে বলা হয়েছে। বিবাহের এখনো সাতদিন বাকী তা সত্বেও জেলা শহর বাগের হাট থেকে পালকির দল এসে হাজির। কাচারিঘরে তাদের থাকা খাওয়ার বন্দোবস্ত করা হয়েছে, বাড়ির সামনেই বিশাল আমবাগান, নাচেগানে ছোটছোট বাচ্চাদের আনন্দ দেখে কে। 'পালাগানে যে দল বিজয়ী হবে তাদের পুরস্কৃত করা হবে'- এ খবর ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগেনি। আশপাশের গ্রাম ছিলনা, গুয়োদানা, রঘুনাথপুর থেকে পালাগানের দল এসেছে। সারাদিন গল্পগুজব, এরপর রাতে শুরু হয় গানের আসর। প্রত্যেক দলে একজন করে সুন্দরী 'প্রিন্সেস' আছে, তার নাচগান দেখার জন্য যেসব যুবক রাতে ব্যাটারিচালিত রিকসা নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতো তা এখন বন্ধ প্রায়। সব মিলে অলোক সোনিয়ার বিবাহ এখন কেবল গ্রামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, সমগ্র জেলা শহরে এর আনন্দ ছড়িয়ে পড়েছে।
গত সাতদিন বিবাহ উপলক্ষে ব্যস্ত সময় কাঁটাচ্ছে একদল মানুষ। অনুষ্ঠানে পিঠাপুলির আয়োজন ছিল চমকপ্রদ। গাঁয়ের মেয়েরা দল বেঁধে অন্দরমহলে বসে জারি গানের সুরে সুরে পিঠা বানাচ্ছে। মূল অনুষ্ঠানে ১১টা গরু, একশো'র মতো খাসি আর এক হাজার মোরগ- সে এক বিশাল আয়োজন। ঘোষালের দধি সাজানো দেখে মনে হচ্ছে মেলায় পসরা সাজিয়েছে।
সুষ্ঠুভাবে বিবাহ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়ে গেলো। আতিথেয়তায় সবাই মুগ্ধ। রঘুনাথপুর গ্রামের গাতক দলকে কালার টিভি দিয়ে পুরস্কৃত করা হলো। সকল দলের সদস্যরা পাজামা-পাঞ্জাবি আর গাঁয়ের মেয়েরা একটা করে শাড়ি নিয়ে নবদম্পতিকে আশীর্বাদ করার মধ্য দিয়ে অলোক সোনিয়ার বিবাহ সুসম্পন্ন হয়ে গেল।