নোবেল বিজয়ী মিশরীয় কথাশিল্পী নাগিব মাহফুজ’র উপন্যাস ‘আমাম আল-আরশ’ বা ‘আরশের সামনে’ (ইংরেজি নাম ‘বিফোর দ্য থ্রোন) শুধু মিশরের পুরোনো দিনের কাহিনি নয়; বরং এটি সুদূর অতীত থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত মিশরের সমগ্র ইতিহাসের চিত্র। যেসব শাসক তাদের নিজ নিজ যুগে মিশরের নেতৃত্ব দিয়েছেন, বিচারের জন্য তাদের মুখোমুখি করা হয়েছে দেবতা‘ওসিরিস’ এর। প্রাচীন মিশরীয় ধর্মবিশ্বাস অনুযায়ী ‘ওসিরিস’ উর্বরতা, কৃষি, পরকালীন জীবন, মৃত্যু, পুনরুত্থান ও সজীবতার দেবতা। পৃথিবীতে শাসকরা কে কি করেছেন, তা বিচার করবেন দেবতা ‘ওসিরিস’। মানুষের আত্মার ভাগ্য নির্ধারণ করবেন ‘ওসিরিস’।
১৯৮৩ সালে প্রকাশিত গ্রন্থটি সম্পর্কে লেখক বলেছেন, ‘এটি কোনো ফিকশন নয়’। বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে বলা হলে নাগিব মাহফুজ, যার নিজের জীবন প্রায় একশো বছর (১৯১১-২০০৬) বিস্তৃত ছিল, তিনি উত্তর দেন, ‘এটি ইতিহাস।’ যদি তাই হয়ে থাকে, তাহলে এটি অদ্ভুত ধরনের ইতিহাস। যদিও এটি বহু বছরের গবেষণা এবং মিশরের অতীতের ওপর তার সারা জীবনের প্রতিফলনের ওপর ভিত্তি করে রচিত, কিন্তু এর পটভূমি কাল্পনিক এবং সংলাপ সম্পূর্ণভাবে উদ্ভাবিত। তার প্রম তিনটি উপন্যাস, যেগুলো প্রাচীন মিশরের পটভূমিতে লেখা, সেই উপন্যাসগুলোর মতো এটি প্রচলিত ধরনের ঐতিহাসিক উপন্যাস, এমনকি প্রেম কাহিনিও নয়, বরং এটি বিভিনড়ব চরিত্রের মধ্যে এক ধরনের নাটকীয় সংলাপ। এতে মঞ্চ নির্দেশনা সামান্য, তেমন কোনো দৃশ্য নেই, যদিও এর সূচনায় সাজসজ্জার বর্ণনায় সবকিছু খাঁটি সোনার বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
কী কারণে নাগিব মাহফুজ এই বিশেষ রূপকল্পের আশ্রয় নিয়েছেন এবং কী কারণে তিনি মিশরের বিপুল সংখ্যক শাসকের ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক রায় প্রদান করতে চেয়েছেন?
এর উত্তর পাওয়া যায় ইজিপশিয়ান ইউনিভার্সিটিতে (যা বর্তমানে কায়রো ইউনিভার্সিটি) পড়াশোনার সময় গ্রিক দর্শনের সঙ্গে তার পরিচয় এবং নিজের উদ্যোগে মিশরীয় ইতিহাস, সমাজ ও রাজনীতির ওপর তার সারা জীবনের অধ্যয়নের মধ্যে।
(আরবি: نجيب محفوظ) (জন্ম: ডিসেম্বর ১১, ১৯১১ - মৃত্যু: আগস্ট ৩০, ২০০৬) নোবেল বিজয়ী মিশরীয় সাহিত্যিক। নাগিব মাহফুজ মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। মাত্র সাত বছর বয়সে তিনি মিশরীয় বিপ্লবে ১৯১৯ অংশ গ্রহণ করেন। তার মাধ্যমিক পরীক্ষার পরে, তিনি দর্শন বিভাগে ১৯৩০ সালে ভর্তি হন মিশরীয় বিশ্ববিদ্যালয় (বর্তমানে কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়)। ১৯৩৪সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন জরেন। এর পর ১৯৩৬ সালে দর্শনের গবেষণা কাজে একটি বছর অতিবাহিত করেন। পরে তিনি গবেষনা পরিত্যাগ করেন এবং একটি পেশাদার লেখক হয়ে যান। মাহফুজ তারপর আল-রিসালায়ের জন্য একজন সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেন, এবং এল-হিলাল এবং আল-আহরাম ছোটোগল্প লিখতে অবদান রাখেন। নাগিব মাহফুজ ১৭ বছর বয়স থেকে লেখালেখি শুরু করেন। ১৯৩৯ সালে তার প্রথম উপন্যাস প্রকাশিত হয়। জীবদ্দশায় ৩০টি উপন্যাস লিখেলও ১৯৫৫ থেকে ১৯৫৭ সালের মধ্যে প্রকাশিত কায়েরা ট্রিলজি তাঁকে আরব সাহিত্যের এক অনন্য উচ্চতায় তুলে ধরেন। এতে তিনি ইংরেজ শাসন থেকেমুক্ত হওয়ার সময়কালে মিশরের ঐতিহ্যবাহী শহুরে জীবনধারা ফুটিয়ে তোলেন । এ উপন্যাসের স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি ১৯৮৮ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। নাগিব মাহফুজের উপন্যাসের প্রায় অর্ধেকেরও বেশীর চলচ্চিত্রায়ন হয়েছে। উপন্যাসের পাশাপাশি তিনি ১০০ টিরও বেশি ছোটগল্প রচনা করেছেন। এগুলির বেশীর ভাগই পরে ইংরেজিতে অনুদিত হয়েছে।