এই কাব্য সংকলনটি মূলত মানুষের জীবনের এক দীর্ঘ এবং আবেগঘন পথচলার প্রতিচ্ছবি, যা এক বিষণ্ণ অথচ সুন্দর গল্পের মতো বয়ে চলেছে। এই গল্পের শুরু হয় জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয় অর্থাৎ পিতাকে হারানোর এক গভীর শূন্যতা দিয়ে। কবি এখানে দেখিয়েছেন কীভাবে একজন বাবা বটবৃক্ষের মতো ছায়া দিয়ে সন্তানকে আগলে রাখেন এবং তাঁর চলে যাওয়ার পর সেই শূন্যস্থানটি কীভাবে আজীবন হাহাকার হয়ে রয়ে যায়। স্মৃতির পাতায় বাবার ফেলে যাওয়া চশমা বা লাঠি হয়ে ওঠে এক একটি জীবন্ত ইতিহাস।
গল্পের পরবর্তী ধাপে উঠে এসেছে মধ্যবিত্ত জীবনের এক অদ্ভুত টানাপোড়েন। এখানে মানুষকে প্রতিনিয়ত ভালো থাকার অভিনয় করতে হয়। পেটে ক্ষুধা বা মনে হাজারো অভাব থাকলেও এক চিলতে মিথ্যে হাসি মুখে মেখে আত্মসম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার যে সংগ্রাম, তা এই পাণ্ডুলিপির প্রতিটি পাতায় ফুটে উঠেছে। কবি খুব কাছ থেকে দেখেছেন কীভাবে জীবনের ছোট ছোট শখগুলো অভাবের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসে এবং মানুষ কীভাবে নিয়তির চাকা ঘুরিয়ে টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যায়।
এই জীবন-গল্পে একাকীত্ব এক বিশাল জায়গা জুড়ে আছে। স্বার্থের এই পৃথিবীতে মানুষ ভিড়ের মাঝেও আসলে একা। সম্পর্কের বাঁধনগুলো সময়ের সাথে সাথে ফিকে হয়ে যায়, খুব কাছের মানুষগুলোও একসময় অচেনা হয়ে দূরে সরে যায়। জীবনকে এখানে একটি মঞ্চের সাথে তুলনা করা হয়েছে যেখানে প্রতিটি মানুষ নিজ নিজ চরিত্রে অভিনয় করে বিদায় নেয়। শৈশবের সেই রোদেলা বিকেল, বন্ধুদের আড্ডা আর গ্রামবাংলার মেঠো পথ কবির কাছে এক পরম শান্তির নীড় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যা যান্ত্রিক শহরের কোলাহলে হারিয়ে যাওয়া মানুষের দীর্ঘশ্বাসের প্রতীক।
সবশেষে এই আখ্যানটি আমাদের জীবনের নশ্বরতার কথা মনে করিয়ে দেয়। মহাকালের গর্ভে একদিন আমাদের সকলের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে, ধুলো পড়ে যাবে আমাদের কর্ম আর গৌরবের ওপর। তবুও মানুষ এক বুক আশা নিয়ে স্বপ্ন দেখে, শিশুদের জন্য এক সুন্দর পৃথিবীর প্রার্থনা করে এবং নিজের আদর্শকে টিকিয়ে রাখতে চায়। অপ্রাপ্তির বেদনা আর বিচ্ছেদের নীল ক্ষত বুকে নিয়ে এক সংবেদনশীল মানুষের এই যে বেঁচে থাকার আকুতি, তাই আপনার এই সংকলনটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন-কাব্যের রূপ দিয়েছে। এটি কেবল কিছু কবিতার সমষ্টি নয়, বরং জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি মানুষের আবেগ, সংগ্রাম আর হার না মানা এক অনন্য জীবনগাথা।