বর্তমান গ্রন্থে স্থানপ্রাপ্ত রচনাগুলো অনধিক বারো বছর সময়সীমার মধ্যে লিখিত।
নাম প্রবন্ধটি মুদ্রিত হয়েছিল ১৯৭৬ সালে। মাসিক সমকালের কোন একটি সংখ্যায়। 'রবীন্দ্রনাথের সংস্কৃতি-সাধনা' রচনাটি ড. আনিসুজ্জামান সম্পাদিত গ্রন্থ 'রবীন্দ্রনাথ'-এ স্থান পেয়েছে এবং সেজন্য ওটি লিখিত হয়েছিল। 'ভবিষ্যতের জন্য' রচনাটি ১৯৬৯ সালের দিকে অধুনালুপ্ত 'কণ্ঠস্বর'-এর কোন একটি সংখ্যায় প্রকাশ পেয়েছে। 'মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি চরিত্র' লেখাটি 'পারাপার' নামে আরেকটি সংকলনে ১৯৭৩ সালের দিকে প্রকাশিত হয়েছিল। 'ফেব্রুয়ারি উনিশ শ' বাহাত্তর' রচনাটি উনিশ শ' বাহাত্তর সালে একুশে ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠানোপলক্ষে লিখতে হয়েছে। পরে সেটি জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের 'বই' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। 'শিক্ষার দর্শন' প্রবন্ধটি ১৯৭২ কি '৭৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সেমিনারে পঠিত হয়েছিল। পরে কোথায় ছাপা হয়েছিল মনে পড়ছে না। 'বার্ট্রান্ড রাসেল' লেখাটি অধুনালুপ্ত 'মুখপত্র' পত্রিকায় ১৯৭০ সালের দিকে ছাপা হয়। 'বাংলার ইতিহাস প্রসঙ্গে' রচনাটি মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে কলকাতায় সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত 'অভিযান' পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। বাংলার চিত্র ঐতিহ্য: সুলতানের সাধনা' শীর্ষক রচনাটি লেখা হয়েছে মাত্র মাসকয়েক আগে। এটি 'মূলভূমি' নামে একটি সংকলনে সবে ছাপা হল।
এই গ্রন্থের লেখাগুলো সূচি অনুসারে না দেখে লেখার কালানুসারে বিচার করলে লেখকের মানস পরিণতির একটা ছায়া বোধ করি দৃষ্টিগোচর হবে।
রচনাগুলো প্রেসে দেয়া হয়েছিল তিন বছর আগে এবং প্রায় অর্ধেকের বেশি ছাপাও হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হতে যাচ্ছে এতদিন পর। সেই দুঃখের কথা বলে লাভ নেই। তবু ভাবতে ভাল লাগছে ১৯৮১ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে লেখাগুলো গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হল।
বাঙালি মুসলিম লেখকদের মধ্যে অন্যতম কীর্তিমান কথাসাহিত্যিক আহমদ ছফা একাধারে ছিলেন কবি, ঔপন্যাসিক, সাংবাদিক, গণবুদ্ধিজীবী ও চিন্তাবিদ। বাবা-মায়ের দ্বিতীয় সন্তান আহমদ ছফা জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৩ সালের ৩০ জুন, চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার গাছবাড়িয়া গ্রামে। নিজ এলাকায় তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয়, এবং ১৯৫৭ সালে তিনি ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। ছাত্রাবস্থায় তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সাথে যুক্ত হন এবং মাস্টারদা সূর্যসেনের আদর্শে অনুপ্রাণিত ছিলেন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ভর্তি হলেও সেখানে পড়ালেখা শেষ করেননি, এবং জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের অধীনে পিএইচডি শুরু করলেও তা আর শেষ করা হয়ে ওঠেনি। আহমদ ছফা এর বই সমূহ বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে পাঠকদের মধ্যে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করে। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বই হিসেবে প্রকাশিত হয় তাঁর লেখা প্রবন্ধগ্রন্থ ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’। আহমদ ছফা এর বই সমূহের মাঝে 'ওঙ্কার', 'অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী', 'বাঙালি মুসলমানের মন', যদ্যপি আমার গুরু', 'গাভী বিত্তান্ত' প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। তাঁর আরেকটি উল্লেখযোগ্য কীর্তি হলো জার্মান সাহিত্যিক গ্যাটের অমর সাহিত্যকর্ম 'ফাউস্ট' বাংলায় অনুবাদ করা। আহমদ ছফা এর বই সমগ্র একত্রিত করে রচনাবলি আকারে ৯টি খন্ডে প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানবিরোধী এই সাহিত্যিক 'লেখক শিবির পুরস্কার' ও বাংলা একাডেমির ‘সাদত আলী আখন্দ পুরস্কার’ পেলেও সেগুলো গ্রহণ করেননি। এই পাঠকনন্দিত সাহিত্যিক ২০০১ সালের ২৮ জুলাই ৫৮ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। সাহিত্যে অবদানের জন্য তিনি ২০০২ সালে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক মরণোত্তর 'একুশে পদকে' ভূষিত হন।