কবিতা যখন সুরের সাথে মিলে যায়, তখন শব্দ কেবল উচ্চারিত হয় না- জেগেও ওঠে। কবিতা তখন হয়ে ওঠে অনুরণন, অনুরাগ ও অনুধ্যানের এক অতল গহীন ক্ষেত্র। গীতিমালা সেই অনুরণনেরই এক সংহত রূপ- যেখানে কবিতা ও সংগীত পরস্পরের পরিপূরক হয়ে এক নবতর শিল্পভাষা নির্মাণ করেছে। বিশ্বসাহিত্যের দীর্ঘ পরম্পরায় গীতিকবিতা এক অনন্য ধারা। প্রাচীন গ্রীসের লিরিক কবিতা থেকে শুরু করে বৈষ্ণব পদাবলি, সুফি-সংগীত, রবীন্দ্রসংগীত কিংবা পাশ্চাত্যের আর্ট সং- সবখানেই শব্দ ও সুরের অবিচ্ছেদ্য মিলন। এই ঐতিহ্যের উত্তরসূরি হিসেবেই গীতিমালা তার স্বকীয়তা নিয়ে সরব হতে চেয়েছে।
এই গ্রন্থে সংকলিত কবিতাগুলির বিষয়বৈচিত্র্য মানবজীবনের বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতাকে ধারণ করেছে। দেশাত্মবোধক কবিতায় মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসা নিবেদন, দ্রোহের কবিতায় গণসংগীতের হুংকার, প্রেমের কবিতায় হৃদয়ের অন্তরঙ্গ স্পন্দন, বিরহের কবিতায় ব্যথার নীরব সংগীত, আধ্যাত্মিক কবিতায় আত্মার অনুসন্ধান, জীবন-জীবিকা বিষয়ক কবিতায় সংগ্রাম ও কর্মমুখরতার গীত, আর সংসারের হাসি-আনন্দ ও দুঃখ-বেদনায় মানবজীবনের রঙিন ও রক্তিম বাস্তবতা- ইত্যাদি অনুভব ও অনুভূতির ছোঁয়ায় এটি সমৃদ্ধ হয়েছে।
প্রতিটি কবিতার শব্দের ভাঁজে ভাঁজে আরোপ করা হয়েছে সুরের সম্ভাবনা, ছন্দের প্রবাহে আছে তাল-লয়ের স্পষ্ট ইঙ্গিত। ফলে গীতিমালা কেবল পাঠকের জন্য নয়; এটি শিল্পী, আবৃত্তিকার, গায়ক, সুরকার ও সংগীতানুরাগী সকলের জন্য এক উন্মুক্ত ক্ষেত্র হিসেবে পরিগণিত হতে পারে। সাহিত্য ও সংগীত, ভাব ও বাণী, হৃদয় ও কণ্ঠ- এই সবকিছুর সম্মিলিত সংলাপই গীতিমালা-র প্রাণ। সুতরাং পাঠক ও শ্রোতার হৃদয়ে যদি এই কবিতাগুলি অনুরণন তোলে, যদি কোনো একটি পঙ্ক্তি সুর হয়ে ফিরে আসে জীবনের নির্জন মুহূর্তে, তবেই গীতিমালা তার সার্থকতা খুঁজে পাবে। এই গ্রন্থ সেই প্রত্যাশারই বিনম্র নিবেদন।