তিনটি উপন্যাসিকা ‘বনজা’, ‘ফুলকি’ এবং ‘জন্মকথা’ প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন পত্রিকায়। এই লেখাগুলিকে একটি বইয়ের অংশীদার হিসেবে খুঁজতে গেলে পাঠক অবশ্যম্ভাবী হিসেবে গ্রন্থনার যে কারণ পাবেন তা হল, জীবনের বয়ান নারীর নিজস্ব স্বরে। কিন্তু ‘বনজা’-র মরিয়মকে জানতে জানতে পাঠক পেয়ে যাবেন এমন এক জীবনের আখ্যান, যা একেবারে ঘরের কথা হয়ত নয়। কারণ পাহাড়ি যেসব জনগোষ্ঠী প্রকৃতির সঙ্গে সঙ্গে জীবনাচরণ বদলাতে বাধ্য হন, তাঁদের সেই চলাচলে সরকারি আধিকারিক শিঞ্জিনী সেন আর আমেরিকান গবেষক ও সাংবাদিক মাইকেল কীভাবে জুড়ে যায় ধুমন, জামিলা, মরিয়মদের মতো বন-গুর্জরদের জীবনের চলনে, তার এক ভাষ্য তৈরি হয়। এইসব মানুষের জীবন-জীবিকায় সরকারি উদ্যোগের নানাতল টানাপোড়েন, প্রকৃতিকে নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার তর্ক-বিতর্ক-এর কথা যেমন জানা যায়, তেমনি জানা যায় এই গোষ্ঠীর মানুষের রাজনৈতিক অবস্থান, সাংস্কৃতিক বিশেষত্ব ও মানুষ হিসেবে তাদের স্বপ্ন, বাস্তবতা আর চর্যাও।
‘ফুলকি’ মধ্যবিত্ত জীবনে একটি ছোটমেয়ের বয়ানে সংসারের নানা খুঁটিনাটিকে দেখা, দেখা পরিবারে নতুন পুত্র-সন্তানের জন্মকে ঘিরে নানা পরিবর্তন আর ছোট্ট আদরের মেয়েটির একলা হয়ে পড়ার গল্প। যে মেয়েটি তার প্রতিবেশকে লক্ষ করে তার নিজের মতো করে। স্বপ্ন দেখে কীভাবে মানুষ হিসেবে সে বড় হয়ে উঠতে পারে। নয়নতারা গুপ্ত পশ্চিমবঙ্গের একটি মফলে বড় হয়ে উঠতে উঠতেও কীভাবে ক্রমশ একটা বিস্তৃত জীবন-প্রতিবেশের সূক্ষ্ম বয়ান তৈরি করে, তা পাঠককে ফিরিয়ে দিতে পারে তাদের শৈশব-কৈশোরের ভালোলাগা-মন্দলাগায়।
‘জন্মকথা’ মিথিলার গল্প। মানুষের শিশুর জন্ম দিতে পারা আর না-পারার মতো শারীরবৃত্তিয় একটি কাজ মিথিলার শরীর শুধু নয়, ভাবনা-চিন্তাকে কীভাবে প্রভাবিত করে আর সেই থেকে নিজের অ্যাডপটেড মেয়ের মা হতে পারা আর না-পারাকে ঘিরে যে উত্তেজনা তৈরি হয়, তার আখ্যান। মানুষের জন্মকথার অন্ধকারের গল্পে আলো এসে পড়ে মানুষ হিসেবে মানুষকে ভালোবাসা আর শুশ্রূষার কথা। পাঠক এই তিনটি উপন্যাসিকার ভিতর থেকে তিনজন কিংবা আর বেশি নারীর বয়ানে খুঁজে পেতে পারেন জীবনের আশ্চর্য রসায়ন। হয়তো এসব কিছুই থাকে প্রতিদিনের যাপনকথায়। তাকেই কাহিনির শরীরে বুনে দেন লেখক মানবীবিদ্যার পাঠের উপযোগী করে।