নোম চমস্কির 'প্রোপাগান্ডা অ্যান্ড দ্য পাবলিক মাইন্ড' (Propaganda and the Public Mind) মূলত সাংবাদিক ডেভিড বারসামিয়ান এবং নোম চমস্কির মধ্যে হওয়া একটি সাক্ষাৎকারধর্মী সংকলন, যা ২০০১ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। এই বইটি তার বিখ্যাত 'ম্যানুফ্যাকচারিং কনসেন্ট' (Manufacturing Consent) এবং 'নেসেসারি ইলিউশনস' (Necessary Illusions) বইগুলোর পরিপূরক হিসেবে কাজ করে।
বইটির মূল বিষয়বস্তু নিচে তুলে ধরা হলো:
* মিডিয়া ও প্রাতিষ্ঠানিক কারসাজি: বইটিতে চমস্কি ব্যাখ্যা করেছেন কীভাবে কর্পোরেট এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষমতার স্বার্থে জনমত বা জনমন (public mind) নিয়ন্ত্রণ করে। তারা তথ্যকে এমনভাবে সাজায় বা প্রচার করে যাতে সাধারণ মানুষ তাদের নিজেদের অজান্তেই শাসকগোষ্ঠীর নীতির প্রতি সমর্থন জানায়।
* সম্মতি উৎপাদন (Manufacturing Consent): তিনি দেখিয়েছেন যে গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে সরাসরি শক্তি প্রয়োগ না করে প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে জনগণের সম্মতি "উৎপাদন" করা হয়। এটি মূলত পাঁচটি ফিল্টারের মাধ্যমে কাজ করে: মালিকানা, বিজ্ঞাপন, তথ্যের উৎস, সমালোচনা বা পাল্টা চাপ (flak) এবং সাধারণ শত্রু তৈরি করা।
* ঐতিহাসিক ও সমসাময়িক প্রেক্ষাপট: বইটিতে ১৯৯৯ সালের ডাব্লিউটিও (WTO) বিরোধী 'ব্যাটল অব সিয়াটল' বিক্ষোভ, পূর্ব তিমুরে মার্কিন হস্তক্ষেপ এবং দ্বিতীয় ইরাক যুদ্ধের শুরুর দিকের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
* প্রোপাগান্ডার প্রভাব: চমস্কি দেখিয়েছেন কীভাবে মিডিয়া যুদ্ধের নৃশংসতাকে আড়াল করে বা সাধারণ মানুষের দৃষ্টি ভিন্ন দিকে ঘুরিয়ে দেয়। এতে নাগরিকরা সক্রিয় অংশগ্রহণকারীর বদলে হয়ে পড়ে নিছক "দর্শক"।
* মুক্তির পথ: শুধু সমস্যাই নয়, চমস্কি এখানে সাধারণ মানুষের ক্ষমতার কথাও বলেছেন। তার মতে, মানুষ যদি ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিকল্প মিডিয়া এবং আন্দোলনের মাধ্যমে কর্পোরেট আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করে, তবে অর্থবহ পরিবর্তন সম্ভব।
সংক্ষেপে, বইটি আমাদের শেখায় মূলধারার সংবাদের আড়ালে থাকা সত্যকে চেনার এবং স্বাধীনভাবে চিন্তা করার উপায়।
নোম চমস্কি অধ্যাপক নোম চমস্কি এমআইটির ভাষাবিজ্ঞানের অধ্যাপক। ভাষাবিজ্ঞান নিয়ে তার গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত কাজ রয়েছে। কিন্তু সেই পরিচয় ছাপিয়ে অধ্যাপক চমস্কি হয়ে উঠেছেন আমাদের এই শতকের প্রধান রাজনৈতিক ঐতিহাসিক ভাষ্যকার। নিউ ইয়র্ক টাইমসসহ নানান মূলধারার ও বিকল্প মাধ্যম তাকে চিহ্নিত করেছে এই শতকের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তক হিসেবে। তাকে ‘আমাদের সময়ের নায়ক’ হিসেবে অভিহিত করেছে নিউ স্টেটসম্যান পত্রিকা। তিনি জন্মেছিলেন ১৯২৮ সালের ৭ই ডিসেম্বর, একটি শরণার্থী ইহুদি পরিবারে। ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরোধিতার মধ্য দিয়ে শুরু হয় তার এক্টিভিস্ট বা সক্রিয়তাবাদী ভুমিকা। সেই সময়ই, ১৯৬৭ সালে তিনি লেখেন এক ঐতিহাসিক প্রবন্ধ, ‘The responsibility of intellectuals’ এই প্রবন্ধের মধ্য দিয়ে তিনি জনগণের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের একজন প্রধান বুদ্ধিবৃত্তিক মানুষ হিসেবে আবির্ভূত হন এবং সেই থেকে গত অর্ধ শতকের অধিক সময় ধরে তিনি বিশ্ব রাজনীতির প্রায় সকল গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে সরব থেকেছেন। বলাই বাহুল্য, তার পক্ষচারণ সবসময়ই গণমানুষের পক্ষে, সাম্রাজ্যবাদ ও পশ্চিমা শোষকশ্রেণির বিপক্ষে।