“আমরা সবাই পথিক। মানুষের মন্যুষত্বের পথে চলবার সর্বপ্রকার দাবি অঙ্গীকার করে আমরা সকল বাধা ভেঙ্গেচুরে চলব”
এই হল পথের দাবীর মূলমন্ত্র। সাদা চামড়া না হওয়ার অপরাধে যখন কাউকে বেঞ্চে বসতে দেয়া হয় না, আইনের কাছে যখন নিপীড়ক পার পেয়ে যায়, শাস্তি পায় নিপীড়িতরা, তখন বোঝা যায় স্বাধীনতা কী চরমভাবে অবহেলিত হচ্ছে, কী ভীষণ রকমের দরকার হয়ে উঠেছে স্বাধীনতার ছোঁয়া। স্বাধীনতা মানে তো কেবল শুধুমাত্র দু’বেলা ভরপেট খাবার খাওয়া নয়, স্বাধীনতার ব্যাপ্তি আরো অনেক বেশি বিস্তৃত।
শরৎচন্দ্রের সময়টা ছিল বৃটিশ শাসিত। পরাধীনতার শেকল ভেঙে এক নতুন জাগ্রত সমাজ তৈরির স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। তারই তো প্রতিচ্ছবি পথের দাবী। সব্যসাচী চরিত্রটি তো তারই চিত্র বহন করে। সব ভেঙেচুরে নতুন স্বাধীন সমাজ গড়ে তোলার প্রত্যয় ফুটে ওঠে। গান্ধীর অহিংস আন্দোলনে সমাজের এতদিনের পুরনো শেকল ভেঙে ফেলা সম্ভব, এতে বিশ্বাস ছিল না শরৎচন্দ্রের। তিনি মনে করতেন, আঘাতে আঘাতে সমাজকে পরিবর্তন করতে হবে আগামীর জন্য। শরৎচন্দ্র বলেছিলেন,
“পথের দাবীর বাস্তব প্রতিফলন ঘটাচ্ছে সূর্যসেন। আমার আশীর্বাদ রইলো তার সাথে।”
শরৎচন্দ্রের এই ভাবমূর্তি দেখা যায় মূল চরিত্র সব্যসাচীর মাধ্যে। তিনিই এই বিপ্লবের নায়ক। আবার অন্যদিকে এর মধ্যে পাওয়া যায় সনাতনী চেহারা। পরিবর্তন চায়, কিন্তু পুরাতন শেকল ভেঙে ফেলার জন্য যে বিপ্লবের দরকার, তাতে ভয় হয়। ভবিষ্যতের জন্য কেন আজকের সময়গুলো নষ্ট, কেন আজকের মানুষগুলোর ওপর অন্যায়, কেন শুধু তথাকথিত এলিট ক্লাস নিয়েই চিন্তা, কেন প্রান্তিক মানুষগুলো জানতেও পারবে না স্বাধীনতা কী, কেন তারাও অংশগ্রহণ করবে না?- ইত্যাদি নানা প্রশ্ন মাথায় ঘোরে সব্যসাচীর মাথায়। অন্যদিকে গল্পের আরেক চরিত্র অপূর্ব। সাধারণ জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে সে। সবচেয়ে খারাপ অবস্থান এই সাধারণ জনগণেরই। পরাধীনতা এদের অস্থিমজ্জায় এমনভাবে আছে যে তাদের আর কিছু বোধ হয় না স্বাধীনতা-পরাধীনতা নিয়ে। হয়তো কখনো কখনো খারাপ লাগে, কিন্তু এত কঠিন বিষয় নিয়ে মাথা ঘামিয়ে সময় নষ্ট ছাড়া আর কী? তাই নিজের স্বার্থ বাচাতে অপূর্বের দলের বাকিদের সাথে বেইমানি করতেও বাধেনি।
সমাজের নানা অসঙ্গতি লেখনীর মাধ্যমে তুলে ধরার পাশাপাশি রাজনীতিতেও ছিলেন সক্রিয়। স্বাধীনতা সংগ্রামে যেসব নারীরা যোগ দেন তাদের মধ্যে অনেকেই এসেছিল বারাঙ্গনা পল্লী থেকে। সেখানে একটি মেয়ে ছিল বিমলা নামে। অসম্ভব সাহসী, বুদ্ধিমতী, চৌকস একজন নারী। পরবর্তীতে শরৎচন্দ্রকে জিজ্ঞেস করা হয়, পথের দাবীর সুমিত্রাই কি বিমলা? এর জবাবে তিনি বলেন,
“হতেও পারে, আবার না-ও হতে পারে, মেয়েটা কিন্তু সত্যিকার প্যাট্রিয়ট৷ যেখানেই থাকুক, যা-ই করুক, স্বদেশকে ও চিরকাল ভালবাসবে৷”
বইয়ের প্রতিটি পাতায় আছে মানুষকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলার এক প্রেরণা। শুধুমাত্র শান্তিতে জীবন পার করাই জীবনের স্বার্থকতা নয়। মানুষ তার নিজের ইচ্ছানুযায়ী চলবে, কিন্তু অপরের ইচ্ছা যখন তার ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়, তখন ব্যক্তিস্বাধীনতা কোথায় আর থাকে? শাসক যখন হয় শুধুমাত্র শোষণের জন্য, তখন সেই শাসনরূপী শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পথের দাবীর দরকার অবশ্যই আছে।
কিন্তু পথের দাবীর এই পথচলা সহজ কেন হবে! জীবন যাত্রায় মানুষের পথচলার এই অধিকার যে কতখানি বিশাল, তা যেন মানুষ ভুলে গেছে। নানা বন্ধুর পথ পেরিয়ে চলা পথের দাবীর। তার মধ্যে আসে নানা বাধা বিপত্তি, কিন্তু তা-ই বলে তো থেমে গেলে তো হবে না। বহুদিনের চলতে থাকা সমাজের সংস্কারকে সরিয়ে নতুন জায়গা দিতে সংগ্রাম তো চালিতে যেতেই হয়। তবে শেষ পর্যন্ত পথের দাবী কতটুকু সফল, তা নাহয় পাঠকেরাই নির্ধারণ করবে।